বাংলায় হনুমান চালিশা

হনুমান চালিশা হল ভগবান হনুমানের উদ্দেশ্যে, হনুমানজির পবিত্র গুনোগান । ১৫ শতাব্দীর বিখ্যাত কবি তুলসীদাস হনুমান চালিশাটি রচনা করেছিলেন আবাধি ভাষায়। কবি তুলসী দাস রামচরিতমানসও রচনা করেছিলেন এবং প্রভূত খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। চালিশা শব্দটি হিন্দি শব্দ চাল্লিশ থেকে গৃহীত। হনুমান চালিশাটি দ্বিপদী শ্লোক এ লেখা। এটি মোট ৪৩ টি ভাগে বিভক্ত যার মধ্যে সূচনায় দুটি দোহা, ৪০ টি চৌপাই এবং একটি দোহা শেষে অবস্থান করেছে।

 

বাংলায় হনুমান চালিশা দোহাঃ

 

   শ্রী গুরুচরণ সরোজ রজ, নিজ মনু মুকুর সুধারী।

বরণউ রঘুবর বিমল জসুজো দায়কু ফল চারি।।

বুদ্ধিহীন তনু জানিকে, সুমিরৌ পবনকুমার।

বল বুদ্ধি বিদ্যা দেহু মোহি, হরহু কেলেস বিকার ।।

এখানে কবি তুলসী দাস গুরুর আশীর্বাদ কামনা করেছেন -‘ শ্রীগুরুচরণ সরোজ রজ ‘- যখনই কোন কেউ কিছু পবিত্র জিনিস শুরু করতে চায় তখনই তার গুরুর আশীর্বাদ প্রয়োজন হয়।  এখানে ‘চরণ ‘বলতে গুরুর পদ্মের মতো চরন দুটি  বোঝানো হয়েছে। ‘সরোজ ‘কথাটির অর্থ হল পদ্ম এবং ‘রজ ‘বলতে বোঝায় ধূলিকণা কে। তুলসী দাস তার কবিতা শুরু করার আগে গুরুর চরণের ধুলি নিয়ে কাজটি শুরু করতে চাইছেন।

নিজ মনু মুকুর সুধারী কবি তাঁর সমস্ত মনের অস্বচ্ছতা এবং ময়লা পরিষ্কার করে ফেলতে চান। এখানে কবি একটি আপাত- বিরোধী সত্য কথা বলেছেন । তিনি তাঁর  মনের সমস্ত রকম ময়লা পরিষ্কার করতে চান গুরুর চরণ ধুলি দিয়ে। পাঠকের কাছে মনে হতে পারে কোন অপরিষ্কার জিনিস কে ধূলিকণা দিয়ে পরিষ্কার করা কিভাবে সম্ভব? এখানে মনে রাখতে হবে কবি তুলসী দাস যে ধূলিকণার কথা বলছেন সেটা কোন সাধারণ ধূলিকণা নয়, এই ধূলি কণা হল  ঐশ্বরিক ধূলিকণা।

এখানে পদ্ম ফুলের উল্লেখও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। পদ্মফুল যেমন অপরিষ্কার  জলে জন্মায় কিন্তু তার চারপাশের পরিবেশকে শুদ্ধ করে তোলে ঠিক সেই রকম তুলসীদাস যে গুরুর প্রার্থনা করেছেন তিনি পার্থিব জিনিসের মোহ মায়ার ঊর্ধ্বে বিরাজ করেছেন।

বরণউ রঘুবর  বিমল যশু জো দায়ক ফল চারি এখন যেহেতু কবির  মনের সমস্ত ময়লা পরিষ্কার হয়ে গেছে সুতরাং তিনি এখন রঘুবর তথা ভগবানের রামের কথা শুরু করতে পারেন।

তুলসীদাস রচিত  ‘ বরনউ রঘুবর বিমল জসু ,জো দায়ক ফল চারি‘- লাইনটির একটি অন্য ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব। দ্বিতীয় মতানুসারে, ‘রঘুবর ‘বলতে এখানে ভগবান রামচন্দ্রকে বোঝানো হয়নি, বরং ‘রঘুবর’ হলেন হনুমানজি নিজেই। কারণ হিসেবে বলা যায় ‘রঘুবর ‘কথাটির আক্ষরিক অর্থ হলো  যে ব্যক্তি রঘুরাজ্ বংশের অন্তর্ভুক্ত। মাতা সীতা দেবী এবং ভগবান রামচন্দ্র হনুমানজিকে একাধিকবার তাদের সন্তান হিসাবে উল্লেখ করেছেন।

হনুমানজি যখন সীতা দেবীকে অশোক বাটিকায় খুঁজে পান এবং রামচন্দ্রের দেওয়া মুদ্রাটি সীতা মাতাকে দেখান তখন সীতা-মাতা আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠেনএবং হনুমানজিকে রামচন্দ্রের সন্তান বলে উল্লেখ করেন। দ্বিতীয়ত, হনুমানজি যখন প্রভু রামচন্দ্রকে সীতা  মাতার  সন্ধান দেন তখন প্রভু রামচন্দ্র আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠেন এবং হনুমানজিকে বুকে জড়িয়ে ধরেন নিজের সন্তান বলে।

এইভাবে হনুমানজির রঘু রাজবংশে অন্তর্ভুক্তি ঘটেছিল। সবশেষে কবি বলেছেন পার্থিব মোহ মায়ায় আবদ্ধ লোকেরা হনুমানজির গুনগান আবৃত্তি করলে ধর্ম, অর্থ, মোক্ষ এবং কর্ম লাভ করবে। অপরপক্ষে ,ভক্তগণ হনুমান চালিশা পাঠ করলে লাভ করবে গুঞ্জন যার অর্থ হলো প্রভুর নিকটবর্তীতা।

কবি তুলসীদাস দ্বিতীয় দোহাটি শুরু করেছেন —

   বুদ্ধিহীন তনু জানিকে, সুমিরৌ পবনকুমার।

বল বুদ্ধি বিদ্যা দেহু মোহি, হরহু কেলেস বিকার ।।

 

—- যেখানে কবির ভগবানের প্রতি সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ লক্ষ্য করা যায়।

এখানে পার্থিব জীবন ও আধ্যাত্মিক জীবনের বৈপরীত্য দেখানো হয়েছে। কবি পাঠকগণকে বোঝাতে চাইছেন যখন কোন ব্যক্তি সম্পূর্ণরূপে প্রার্থীব মোহ মায়ায় আচ্ছন্ন থাকেন তখন তার পক্ষে আধ্যাত্মিক জীবনের মূল্য বোঝা সম্ভব হয় না। কবি তুলসীদাস তার হৃদয়ের সমস্ত অন্ধকারকে দূরীভূত করতে গুরুর কৃপা প্রার্থনা করেছেন।

তিনি নিজেকে সম্পূর্ণরূপ  ‘বুদ্ধিহীন’ মনে করেন এবং সেই কারণেই তার প্রয়োজন আধ্যাত্মিক শক্তির যার দ্বারা তিনি হনুমানজির জয়গান গাইতে পারেন। কবি এখানে তাঁর  পাঠকসহ সমস্ত সাধারণ মানুষকে দিশা নির্দেশ করেছেন কিভাবে  তাঁরা তাঁদের আধ্যাত্মিক জীবনের সূচনা করবে। ঠিক যেভাবে কবি ‘পবন কুমারের ‘ (হনুমানজি) সাহায্য চাইছেন, ঠিক সেভাবে একজন সাধারণ মানুষ শ্রীগুরুর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করলে ভগবান রাম ও ভগবান কৃষ্ণর কাছে পৌঁছোতে পারবে। কবি পার্থনা করেছেন ‘বল ‘এবং ‘বুদ্ধির ‘ যার দ্বারা তিনি ক্লেশ ও বিকারকে দূরে সরিয়ে ফেলতে পারেন।

(বিকার —- কাম, ক্রোধ ,লোভ ইত্যাদি

ক্লেশ —– অস্মিতা, অবিদ্যা, অভিনিবেশা ,রাগ ইত্যাদি)

 

হনুমান চালিশা চৌপাইঃ

 

জয় হনুমান জ্ঞান গুণ সাগর।

জয় কপিস তিহু লোক উজাগর।।১।।

রামদুত অতুলিত বল ধামা।

   অঞ্জনি পবন সূত নামা।।২।।

মহাবীর বিক্রম বজরঙ্গি।

  কুমতি নিবার সুমতি কে সঙ্গী।। ৩।।

 

কাঞ্চনবরন বিরাজ সুবেসা।

 কানন কুন্ডল কুঞ্চিত কেশা।।৪।।

হাত বজ্র ঔর ধ্বজা বিরাজঐ।

কান্ধে মুঁজ জনেউ সাজ ঐ।।৫।।

শঙ্কর সুবন কেশরী নন্দন।

তেজ প্রতাপ মহা জগবন্ধন।।৬।।

বিদ্যাবান গুণী অতি চতুর।

রাম কাজ করিবে কো আতুর।।৭।।

প্রভু চরিত্র সু নিবে কো রসিয়া।

 রাম লখন সীতা মন বসিয়া।।৮।।

সূক্ষ্ম রূপ ধরি সিয়হি দিখাবা।

বিকটরূপ ধরি লঙ্কা জরাবা।।৯।।

ভীম রূপ ধরি অসুর সংহারে।

 রামচন্দ্রকে কাজ সবারে।।১০।।

লায় সঞ্জীবন লখন জিয়ায়ে।

শ্রী রঘুবীর হরষই উর লায়ে।।১১।।

রঘুপতি কিন হী বহত বড়াই।

তুম মম প্রিয় ভরতহি সম ভাই।।১২।।

সহস বদন তুমহর যশ গাবৈ। 

অস কহি শ্রীপতি কণ্ঠ লাগাবৈ ।।১৩।।

সনকাদিক ব্রহ্মাদি মুনীসা।

নারদ সারদ সহিত অহিসা।। ১৪।।

যম কুবের দিগপাল জহা তে।

কবি কোবিদ কাহি সকে কহা তে।।১৫।

তুম উপকার সুগ্রীবহি কিনহা।

রাম মিলায় রাজ পদ দিনহা ।।১৬।।

তুমহারো মন্ত্র বিভীষণ মানা।

লঙ্কেশ্বর ভএ সব জগ জানা।।১৭।।

যুগ সহস্র যোজন পর ভানু।

লিল্য তাহি মধুর ফল জানু।।১৮।

প্রভু মুদ্রিকা মেলি মুখ মাহি।

জলধি লাঘি গয়ে অচরজ নাহি।।১৯।।

দুর্গম কাজ জগতকে যেতে।

  সুগম অনুগ্রহ করে তুমহরে তেতে।।২০।।

রাম দুয়ারে তুম রখবারে।

হোত না আজ্ঞা বিনু পইসারে।।২১।।

সব সুখ লহই তুমহারী সরনা।

তুম রচ্ছক কাহু কো ভর না।।২২।।

আপন তেজ সমাহারো আপই। 

তীনো লোক হাঁক তে কাঁপই।। ২৩।।

ভূত পিশাচ নিকট নহি আবই।

 মহাবীর জব নাম সুনাবই।।২৪।।

নাসই রোগ হরই সব পীরা

জপত নিরন্তর হনুমদত বীরা।।২৫।।

সংকট তে হনুমান ছড়াবৈ।

 মন ক্রম বচন ধ্যান জো লাবৈ।।২৬।।

সব পর রাম তপস্বী রাজা

তিন কে কাজ সকল তুম সাজা ।।২৭।।

ঔর মনোরম জো কই লাবৈ।

সেই অমিত জীবন ফল পাবৈ।।২৮।।

 

চারো যুগ পরতাপ তুমহারা।

হৈ পরসিদ্ধ জগত উজিয়ারা ।।২৯।।

সাধুসন্ত কে তুম বারে।

অসুর নিকন্দন রাম দুলারে।।৩০।।

অষ্ট সিদ্ধি নৌ নিধি কে দাতা।

অস বর দান জনকী মাতা।।৩১।।

রাম রসায়ন তুমহারে প্যাসা।

সদা রহো রঘুপতি কে দাসা।।৩২।।

 

তুমহারে ভজন রাম কো পাবৈ।

জনম জনম কে দুখ বিসরাবৈ।।৩৩।।

অন্তকাল রঘুবরপুর জাই।

জহা জন্ম হরিভক্ত কহাই।।৩৪।।

ঔর দেবতা চিত্ত না ধরই।

হনুমত সেই সর্ব সুখ করই।। ৩৫।।

সংকট কাটঐ মিটই সব পীরা।

জো সুমিরই হনুমত বলবিরা।।৩৬।।

জই জই জই হনুমান গোঁসাই।

কৃপা করহু গুরু দেব কী নাই।।৩৭।।

 

জো শতবার পাঠ কর কোই।

ছুটহি বন্দি মহাসুখ হোই।।৩৮।।

 

জোয়হ পরই হনুমান চালিশা।

হোয় সিদ্ধ সাখী গৌরিসা।।৩৯।

তুলসী দাস সদা হরি চেরা।

কীজই নাথ হৃদয় মহ ডেরা।।৪০।।

পবন তনয় সংকট হরণ,

 মঙ্গল মূরতীরূপ

রাম লক্ষণ সীতা সহিত,

 হৃদয় বসহু সুর ভূপ।।

 

বাংলায় হনুমান চালিশা পাঠঃ 

 

চৌপাই

 

জয় হনুমান জ্ঞান গুণ সাগর।

জয় কপিস তিহু লোক উজাগর।।১।।

কবি তুলসীদাস এখানে হনুমানজিকে জ্ঞান ও গুনের সাগর হিসেবে অভিহিত করেছেন। এমন সাধারণ লোক খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন যার জ্ঞান এবং গুণ একই সাথে বর্তমান। সাধারণ লোক যাদের অনেক জ্ঞান তাদের অহংকারি হওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় কিন্তু ভগবান রামের প্রিয় ভক্ত হনুমানজি সাধারণ মানুষের থেকে আলাদা।

একজন জ্ঞানী ব্যক্তির বিশেষ কিছু লক্ষণ দেখে তাকে চিহ্নিত করা যায়। অনেকগুলি লক্ষণের মধ্যে একটি হলো তার সুমিষ্ট মুখের ভাষা। ভগবান রামের মত অনুসারে হনুমানজি হলেন একজন সুমিষ্ট বক্তার আদর্শ উদাহরণ। ভগবান রাম এবং লক্ষণের ঋষিমুখ পর্বতে যাওয়ার সময় প্রথমবার হনুমানজির সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়।

তাদের সামনে হনুমানজি একজন ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে এসে উপস্থিত হন। প্রথমবারের জন্য ছদ্মবেশী ব্রাহ্মণটি কথা বলতে শুরু করলে ভগবান রাম তৎক্ষণাৎ উপলব্ধি করেন ব্যক্তিটি একজন সুমিষ্ট বক্তা এবং তার ভাই লক্ষণকে বলেন এই হল সেই আদর্শ ব্যক্তি যাকে তারা সম্পূর্ণরূপে বিশ্বাস করতে পারেন। তিনি আরো বলেন এই ব্রাহ্মণের কথার মধ্যে এমন স্বর্গীয় মিষ্টতা আছে যা শুনলে শত্রুরাও তাদের হাতিয়ার নামিয়ে নেবে। এইভাবে যারা জ্ঞানকে আত্মস্থ করেছেন তাদেরই সুমিষ্ট ভাবে কথা বলার ক্ষমতা রয়েছে। সেই জন্য কবি বলেছেন —-

জয় হনুমান জ্ঞান গুণ সাগর

ঠিক এরপর কবি তুলসীদাস হনুমানজিকে ‘গুণের সাগর বলে অভিহিত করেছেন । হনুমানজির নিশ্চিত ভাবে অনেক মহান গুণ রয়েছে। একদা হনুমানজি, সূর্যদেবের কাছে শিক্ষা নেওয়ার জন্য উপস্থিত হয়েছিলেন কিন্তু সূর্যদেব প্রাথমিকভাবে হনুমানজিকে তাঁর  শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করতে রাজি হননি। তিনি হনুমানজিকে বলেছিলেন তার শ্রেণীকক্ষ ইতিমধ্যেই ৬০ লক্ষ শিক্ষার্থী তে পরিপূর্ণ। হনুমানজি যুক্তি দেখিয়ে বলেছিলেন তার কোন শ্রেণীকক্ষের প্রয়োজন নেই।

তিনি সূর্যদেবের শিক্ষা তাঁর  পৃথিবী ভ্রমণকালীন গ্রহণ করবেন। শিক্ষাশেষে গুরুদক্ষিণা হিসেবে সূর্যদেব তাঁর র পুত্র সুগ্রিব  দায়ভার গ্রহণ করতে বলেন। কেবলমাত্র তাঁর র গুরুকে খুশি করতে বিনা দ্বিধায় হনুমানজি সুগ্রিবের  সমস্ত দায়ভার গ্রহণ করেন।  যখন প্রভু দেখেন কোন ভক্তের নিঃস্বার্থ আত্মসমর্পণ তখন তিনি খুব খুশি হন। সেই জন্য হনুমানজিকে বলা হয়েছে ‘জ্ঞান গুণ সাগর/ জয় কপিস তিহু লোক উজাগর’ এখানে ‘কপিস ‘একটি সংস্কৃত শব্দ যার অর্থ হনুমান।

রামদুত অতুলিত বল ধামা।

   অঞ্জনি পবন সূত নামা।।২।।

 

রামদূত কথাটির অর্থ হল হনুমানজি হলেন ভগবান রামের পরিচারক তথা প্রিয় ভক্ত।

অতুলিত বল ধামা ‘এ বিষয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই যে হনুমানজি ছিলেন এমন একজন বলবির যাকে ক্ষমতায় হারানো অসম্ভব। তিনি এত ক্ষমতার অধিকারী হতে পেরেছিলেন কারণ তিনি ছিলেন ভগবান রামের একনিষ্ঠ পরিচারক। সর্বোপরি, তিনি ভগবান রামকে এক মুহূর্তের জন্য ভুলতেন না কারণ তিনি তাকে সর্বদা তার হৃদয়ে বয়ে বেড়াতেন। তাই ‘অতুলিত বল ধামা ‘বলতে কেবলমাত্র হনুমানজির শারীরিক ক্ষমতাকে বোঝানো হয়নি সাথে সাথে ভগবানের রামচন্দ্র কে হৃদয়ে সর্বদা বয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতাকেও বোঝানো হয়েছে।

বাস্তবিক পক্ষে হনুমানজির মা ছিলেন একজন অপ্সরা। তাঁর নাম হল পুঞ্জিকাস্থলা। অন্যান্য অপ্সরারা তাদের নিজেদের সৌন্দর্য  মনোরঞ্জন নিয়ে খুব ব্যস্ত থাকতেন কিন্তু পঞ্জিকস্থলা ছিলেন আধ্যাত্মিক মননের। একদা গুরু বৃহস্পতি খুব খুশি হয়েছিলেন পুঞ্জিকাস্থলার  কাছ থেকে একটি রুদ্রাক্ষমালা গ্রহণের পর এবং তিনি ভুলবশত তাঁকে আশীর্বাদ দিয়ে ফেলেন একটি সর্ব গুনোসম্পন্ন সন্তানের মা হওয়ার।

পরে গুরু বৃহস্পতি বুঝতে পারেন অপ্সরা রা সন্তানের মা হতে পারে না। যার ফলে তাঁর র ভুল শোধরানোর জন্য পুঞ্জিকাস্থলাকে ঋষি দুর্বাস  কে দেখাশোনার জন্য নিয়োগ করেন। ঋষি দুর্বাসা ছিলেন সমস্ত ঋষিদের মধ্যে বদমেজাজি। ঠিক যেমনটা আশা করা হয়েছিল ঋষি দুর্বাসা  পুঞ্জিকাস্থলার সামান্য ভুলে রাগান্বিত হয়ে তাঁকে বানর হয়ে জন্মানোর অভিশাপ দেন। অভিশাপ প্রাপ্ত হয়ে অঞ্জনা নামে গুঞ্জরা রাজার কন্যা রূপে জন্মগ্রহণ করেন এবং পরবর্তীকালে তাঁর বিবাহ কেশরীর সাথে হয়। দীর্ঘদিন ধরে অঞ্জনার কোন সন্তান-সন্ততি হয়নি। পরবর্তীকালে অঞ্জনা গুহার মধ্যে ধ্যানমগ্ন হয় ও ঈশ্বরের কাছে সন্তানের জন্য

প্রার্থনা করেন। ঠিক এই সময় অযোধ্যা নগরীতে একটি যজ্ঞ হয় যার উদ্দেশ্য ছিল অযোধ্যা রানীদের সন্তান লাভ। অগ্নিদেব পায়েস নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন সেই যোগ্যস্থলে এবং পায়েসটি সমানভাগে রানী কৌশল্যা , কৈকেয়ী ও সুমিত্রার মধ্যে ভাগ করার আয়োজন করছিলেন। ঠিক এই সময় একটি  ঈগল এসে পায়েসের কিছুটা অংশ ছিনিয়ে নিয়ে চলে যায়। কিছুদূর যাওয়ার পর ঈগলটি পায়েসটিকে বাতাসে ফেলে দেয়। পবন দেব পায়েসটিকে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে অঞ্জনার কাছে ফেলে দেয়। এইভাবে হনুমানজি, তাঁর মা অঞ্জনার গর্ভে এসেছিল। সেই জন্য হনুমানজি হলেন কেশরিনন্দন বা  কেশরীর পুত্র এবং অঞ্জনী-পুত্র অঞ্জনার পুত্র এমনকি তিনি পবন পুত্র কারণ পবনদেব ই মাতা অঞ্জনার কাছে পায়েস পৌঁছে দিয়েছিলেন।

মহাবীর বিক্রম বজরঙ্গি।

  কুমতি নিবার সুমতি কে সঙ্গী।। ৩।।

এখানে ‘মহাবীর ‘কথাটির অনেক রকম অর্থ আছে।

‘মহাবীর বলতে বোঝায় সেই ব্যক্তিকে যে শারীরিকভাবে অনেক অসাধ্য কাজ করতে সক্ষম। অপরপক্ষে মহাবীর বলতে আরো বোঝায় যে ব্যক্তি একাধিক জটিল কাজ নিজেই করতে পারে। এখানে হনুমানজি হলেন প্রকৃত অর্থে মহাবীর তিনি দয়া ,মায়া আত্মত্যাগ ইত্যাদি গুণে সমৃদ্ধ। এই অর্থে হনুমানজি একজন প্রকৃত মহাবীর।

বিক্রম বজরঙ্গিএখানে ‘বিক্রম’ কথাটির অর্থ হলো বিশালাকার। ‘বজরঙ্গি‘ কথাটি হল একটি নাম যেটা  হনুমানজিকে দেওয়া হয়েছে। একটি বহুল প্রচলিত পৌরাণিক কাহিনী আছে যেখান থেকে আমরা জানতে পারি হনুমানজির নাম কিভাবে বজরঙ্গী হয়েছিল।

শৈশবকালে হনুমানজি, সূর্যকে আপেল ভেবে গিলে খেয়ে ফেলেছিলেন। অজান্তে ইন্দ্রদেব এই ঘটনায় খুব রাগান্বিত হয়ে হনুমানজির, চোয়াল দুটি ভেঙ্গে দেন তার বজ্রর দ্বারা। তিনি জানতেন না সূর্যকে গলাধকরণ করা একটি শিশুর দুষ্টুমি মাত্র। দেবরাজ ইন্দ্রের কাজে  পবন দেব প্রচন্ড রাগান্বিত হন এবং পৃথিবী থেকে সমস্ত বাতাস শোষণ করতে থাকেন। শেষমেষ সমস্ত দেবদেবতাগণ এসে বিষয়টি সমাধান করেন। ইন্দ্রদেব তার ভুল স্বীকার করে নেন এবং হনুমানজিকে আশীর্বাদ করেন সেই দিনের পর থেকে হনুমানজির শরীরের প্রত্যেকটি অঙ্গ বজ্রের মত বলশালী হয়ে উঠবে। এইভাবে হনুমানজি তার বজরঙ্গি নামটি পেয়েছিলেন। (হনু একটি সংস্কৃত শব্দ যার অর্থ হলো চোয়াল)।

কুমতি নিবার সুমতি কে সঙ্গী‘ —-হনুমানজি সর্বদা অসৎ এর সংস্রাব ত্যাগ করেন এবং সৎ জনের সংস্রাব গ্রহণ করেন।

  হনুমান চালিশা আরতি বাংলাঃ 

কাঞ্চনবরন বিরাজ সুবেসা।

 কানন কুন্ডল কুঞ্চিত কেশা।।৪।।

‘কাঞ্চনবরণ বিরাজ সুবেসা’ – হনুমানজির শরীর সোনালী রঙের এবং তিনি স্বর্গীয় পোশাক দ্বারা আবৃত। ‘কানন কুন্ডল’ হনুমানজি কানের দুল পরিহিত হয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন । এই কানন কুন্ডলেরও একটি পৌরাণিক কাহিনী বর্তমান।

যখন হনুমানজি তার মা  অঞ্জনার গর্ভে ছিলেন তখন নারদ মুনি বালির কাছে আসেন এবং তাকে এই সংবাদটি দেন যে একজন বিশেষ কেউ মাতা অঞ্জনার গর্ভ  থেকে জন্মগ্রহণ করতে চলেছেন যে বালির সমস্ত অহংকার ধুলোয় মিশিয়ে দেবে। দুষ্টু বালি তৎক্ষণা তার না জন্মানো শত্রুকে শেষ করবার একটি পরিকল্পনা তৈরি করেন। সে কেশরী এবং অঞ্জনাকে রাজপ্রাসাদে  নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানান এবং তিনি অঞ্জনাকে রাজকীয় ঝোলের পরিবর্তে পাঁচটি বিষাক্ত ধাতু দিয়ে তৈরি ঝোল পরিবেশন করেন। কিছুদিন পর বালি লক্ষ করেন অঞ্জনার ধাতু মিশ্রিত বিষাক্ত ঝোলে মৃত্যু ঘটেনি। বরং একটি সুস্থ সন্তানের জন্ম দিয়েছে যার কানে জন্মগত ধাতব একটি দুল রয়েছে। সেই জন্য ‘কানন কুন্ডল’।

‘কুঞ্চিত কেশা’ হনুমানজির কেশ ছিল কোঁকড়ানো এবং এই কেশ ছিল স্বর্গীয়।

হাত বজ্র ঔর ধ্বজা বিরাজঐ।

কান্ধে মুঁজ জনেউ সাজ ঐ।।৫।।

 

এখানে কবি তুলসীদাস একজন বিচক্ষণ  হস্তরেখাবিদ এর মত হনুমানজীর হাতের ও পায়ের যে শুভ রেখা গুলি আছে তার কথা বলেছেন। হস্তরেখাবিদদের মত অনুসারে হাতের এই শুভ রেখা গুলি ভবিষ্যৎ বলতে সক্ষম। হনুমানজির হাতে চক্র, বজ্র , ধ্বজা ইত্যাদির মত শুভ লক্ষণ বিরাজমান। সেই জন্যই কবি বলেছেন ‘হাত বজ্র ঔরো ধ্বজা বিরাজ ‘।

কাঁধে মুঁজ জনেঊ সাজঐ এখানে কবি তুলসীদাস হনুমানজির কাঁধের পবিত্র পৈতার কথা বলেছেন। একজন ব্যক্তি পৈতে পরিধান করার অর্থ হলো সেই ব্যক্তি ধর্মগ্রন্থ ও বেদের সম্যক জ্ঞান অর্জন করেছে।

শঙ্কর সুবন কেশরী নন্দন।

তেজ প্রতাপ মহা জগবন্ধন।।৬।।

 

‘শঙ্কর সুবন কেশরী নন্দন ‘ —- হনুমানজি হলেন ভগবান শিবের ও সন্তান আবার কেশরীর ও সন্তান।

‘তেজ প্রতাপ মহা জগবন্দন ‘ ——- হনুমানজি গৌরবান্বিত চরিত্রের জন্য তিনি তিনটি লোক স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতালে সুপরিচিত ।

বিদ্যাবান গুণী অতি চতুর।

রাম কাজ করিবে কো আতুর।।৭।।

‘বিদ্যাবান গুণী অতি চাতুর’ —- হনুমানজি ছিলেন অতি বুদ্ধিমান।পৌরাণিক কথা অনুযায়ী হনুমানজি সূর্যদেবের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করতে গেলে কিছুদিনের মধ্যেই তিনি সূর্যদেবের প্রিয় ছাত্র হিসেবে বিবেচিত হতে থাকেন।  সূর্যদেব হনুমানজিকে তাঁর ছাত্র হিসেবে এতটাই ভালবেসে ফেলেছিলেন যে তিনি চাইতেন হনুমানজি যেন সারা জীবন তাঁর ছাত্র হিসাবে থাকেন। সেই জন্য সূর্যদেব পরিকল্পনা করে হনুমানজির স্মৃতির বিভ্রান্তি ঘটান যার ফলস্বরূপ হনুমানজি যা শিখতেন কিছুক্ষণ পরেই তা ভুলে যেতেন। বুদ্ধিমান হনুমান বিষয়টি বুঝতে পেরে পারেন এবং সূর্যদেবের কাছে অনুমতি চান তাঁকে যেন কিছু সময়ের জন্য তাঁর নিজের গৃহে ফিরে যাওয়ার।

সূর্যদেব হনুমানজির বুদ্ধি দেখে অবাক হন এবং হনুমানজিকে আশীর্বাদ করেন —— “যে ব্যক্তি হনুমানজিকে স্মরণে রাখবে সেই ব্যক্তি কখনোই তার বিদ্যা ভুলে যাবে না।”

‘রাম কাজ করিবে কো আতুর’ —— হনুমানজি সদা সর্বদা ভগবান  রাম কে সেবা করতে উৎসুক।

প্রভু চরিত্র সু নিবে কো রসিয়া।

 রাম লখন সীতা মন বসিয়া।।৮।।

যখনই কোথাও ভগবান রামের কথা বলা হবে তখনই হনুমানজি সেখানে উপস্থিত থাকবেন।

সূক্ষ্ম রূপ ধরি সিয়হি দিখাবা।

বিকটরূপ ধরি লঙ্কা জরাবা।।৯।।

‘সূক্ষ্ম রূপ ধরি সিয়হি দিখাবা’— যখন হনুমানজি সীতা দেবীর অন্বেষণে অশোক বাটিকায় গিয়েছিলেন তখন তিনি অনেক ক্ষুদ্র এবং নম্র রূপ ধারণ করেছিলেন কারণ তিনি সীতা দেবীর মাতৃ স্নেহ  অর্জন করতে চেয়েছিলেন । কিন্তু  ‘বিকটরূপ ধরি লঙ্কা জরাবা ‘ যখন তিনি লঙ্কায় আগুন ধরিয়েছিলেন তখন তিনি বিকট ও ভয়ংকর রূপ ধরিয়াছিলেন।

ভীম রূপ ধরি অসুর সংহারে।

 রামচন্দ্রকে কাজ সবারে।।১০।।

হনুমানজির বিশালাকায় চেহারা দেখে রণক্ষেত্রের শত্রুরা থরথর করে কাঁপতো। হনুমানজি শত্রু সংহারে ছিলেন নি:ষ্করুন । সেই জন্য বলা হয়েছে ‘ভিম রূপ ধরি অসুর সংহারে ‘।

‘রামচন্দ্র কে কাজ সবারে’ হনুমানজি রামচন্দ্রকে অসংখ্য ভাবে এবংঅসংখ্য   কাজে সাহায্য করেছিলেন।

লায় সঞ্জীবন লখন জিয়ায়ে।

শ্রী রঘুবীর হরষই উর লায়ে।।১১।।

‘লায় সঞ্জীবন লখন জিয়ায়ে ‘ হনুমানজি, সঞ্জীবনী নিয়ে  এসেছিলেন এবং প্রভু  লক্ষণকে জীবিত থাকতে সাহায্য করেছিলেন ।

‘শ্রী রঘুবীর হরষ ই উর লায়ে’ লক্ষণ জীবিত থাকতে সাহায্য করে হনুমানজি ভগবান রামচন্দ্রকে অত্যন্ত খুশি করে তুলেছিলেন।

রঘুপতি কিন হী বহত বড়াই।

তুম মম প্রিয় ভরতহি সম ভাই।।১২।।

এখানে ভগবান রামচন্দ্র হনুমানজির কাজের প্রশংসা করেছেন । তিনি তাকে নিজের ভাই ভারতের সঙ্গে তুলনা করেছেন । যদিও লক্ষণ সদা সর্বদা ভগবান রামের সাথে উপস্থিত কিন্তু ভারত অনেক দূরে থেকেও রামচন্দ্রের হৃদয়ের সর্বদা  অনেককাছে অবস্থান করেছেন । ভগবান রাম ভারতের সমতুল্যে হনুমানজিকে ভালবাসতেন।

সহস বদন তুমহর যশ গাবৈ। 

অস কহি শ্রীপতি কণ্ঠ লাগাবৈ ।।১৩।।

এখানে কবি তুলসীদাস বলেছেন অনন্ত যাকে আমরা চিরন্তন বলে চিনি তিনিও হনুমানজির সাহসিকতার প্রশংসা করেছেন।

রামায়ণে আমরা দেখতে পাই রামচন্দ্র অসংখ্য বার হনুমানজিকে আলিঙ্গন করেছেন ।সেই জন্য বলা হয়েছে

‘অস কহী শ্রীপতি কণ্ঠ লাগাবৈ’

এখানে’ শ্রী’ বলতে সীতা দেবী এবং ‘পতি’ বলতে সীতা দেবীর স্বামী রামচন্দ্রকে বোঝানো হয়েছে।

সনকাদিক ব্রহ্মাদি মুনীসা।

নারদ সারদ সহিত অহিসা।। ১৪।।

‘সনকাদিক ব্রহ্মাদি মুনীসা ‘ বলতে কবি তুলসী দাস হনুমানজিকে সাধু -, মুনী ঋষিদের রক্ষা কর্তা  হিসেবে অভিহিত করেছেন।

শৈশবকালে হনুমানজি নারদ মুনির সাথে একটি দুষ্টুমি করেছিলেন এবং তাঁকে সমস্ত প্রাসাদ দৌড়ানো করেছিলেনকরিয়ে ছিলেন  । নারদ মুনি যখন এর কারণ জানতে চাইলেন তখন হনুমানজি উত্তর দিয়েছিলেন নারদ মুনি কে তিনি সমস্ত প্রাসাদ ছুটিয়েছেন বা ঘুরিয়েছেন কারণ তিনি চেয়েছেন নারদ মুনির চরণ যেন তাঁর প্রাসাদের সমস্ত জায়গায় স্পর্শ করে যাতে করে প্রাসাদের প্রত্যেকটা প্রান্তে তাঁর গুরুর তথা নারদ মুনি উপস্থিত অনুভূত হয়। সেই জন্যই বলা হয়েছে ‘নারদ সারদ সহিত আহিসা ‘।

যম কুবের দিগপাল জহা তে।

কবি কোবিদ কাহি সকে কহা তে।।১৫।

শক্তিশালী রাবণ যম ,শনিদেব, কুবের এবং অন্যান্য দেবতাদের বন্দি বানিয়ে রেখেছিলেন। যখন হনুমানজি সীতা দেবীর অন্বেষণে লঙ্কায় গিয়েছিলেন তখন তিনি সমস্ত দেবতাদের রাবণের কাছ থেকে মুক্ত করেছিলেন। সমস্ত দেবতারাই তার কাছে কৃতজ্ঞ আর সেই কারণেই সমস্ত কবি সন্ন্যাসী সাধুরা,তাঁর জয়গান করতে ব্যস্-‘ কবি কোবিদ কাহি সকে কহা তে ‘।

তুম উপকার সুগ্রীবহি কিনহা।

রাম মিলায় রাজ পদ দিনহা ।।১৬।।

কবি তুলসীদাস এখানে হনুমানজির সৎ গুনের কথা বলেছেন। হনুমানজি সুগ্রীবকে ভগবান রামচন্দ্রের সঙ্গে মেলাতে সাহায্য করেন যিনি পরবর্তীকালে কৃষকিন্দার অধিপতি হন।

তুমহারো মন্ত্র বিভীষণ মানা।

লঙ্কেশ্বর ভএ সব জগ জানা।।১৭।।

এখানে কবি তুলসীদাস হনুমানজিকে প্রশংসা করেছেন বিভীষণ কে সঠিক পথ দেখানোর জন্য।

হনুমান চালিশা

যুগ সহস্র যোজন পর ভানু।

লিল্য তাহি মধুর ফল জানু।।১৮।

এখানে কবি তুলসীদাস সূর্য এবং পৃথিবীর দূরত্ব প্রায় সঠিকভাবে গণনা করেছেন।  শৈশবকালে হনুমানজি ( ১ যুগ= ১২০০০ বছর/ ১ সহস্র = ১০০০/১ যোজন = ৮ মাইল সমান ১২০০০ * ১০০০ * ৮ = ৯৬ ০০০০০০ মাইল, ১ মাইল= ১.৬ কি.মি.) দূরত্ব অতিক্রম করে সূর্যকে মিষ্টি আপেল ভেবে খেতে গিয়েছিলেন।

প্রভু মুদ্রিকা মেলি মুখ মাহি।

জলধি লাঘি গয়ে অচরজ নাহি।।১৯।।

সীতা দেবীকে দেখানোর জন্য ভগবান রামচন্দ্র হনুমানজিকে একটি মুদ্রা দেন । হনুমানজি মুদ্রাটি রাখবার স্থান নির্ধারণ করতে না পেরে মুখের মধ্যে নিয়েছিলেন। মুদ্রাটিতে রাম নাম খচিত ছিল । সেই জন্যই বলা হয়েছে’ প্রভু মুদ্রিকা মিলি মুখ মাহি ‘।

ভগবান রামচন্দ্রের সঙ্গ থাকলে হনুমানজি সাগরে লাফিয়ে পেরোতে পারে, পর্বত কাঁধে নিয়ে আসতে পারে সেই জন্য বলা হয়েছে “জলধি লাগি গয়ে অচরজ নাহি”।

দুর্গম কাজ জগতকে যেতে।

  সুগম অনুগ্রহ করে তুমহরে তেতে।।২০।।

 

যে কাজগুলো আপাত দৃষ্টিতে দেখে কঠিন মনে হয় সেই কাজগুলো হনুমানজি অতি সহজে সম্পন্ন করেছিলেন।

রাম দুয়ারে তুম রখবারে।

হোত না আজ্ঞা বিনু পইসারে।।২১।।

 

হনুমান চালিশা পাঠের উপকারিতাঃ

 

হনুমানজি সারাক্ষণ রামচন্দ্র কে ও লক্ষণকে পাহারা দিয়ে রেখেছিলেন । কারণ বিভীষণ তাদেরকে সতর্ক করেছিলেন যে মহিরাবন এসে ভগবান রাম এবং  লক্ষণকে অপহরণ করে নিয়ে যেতে পারে।

সব সুখ লহই তুমহারী সরনা।

তুম রচ্ছক কাহু কো ভর না।।২২।।

হনুমানজি থাকতে দুশ্চিন্তার কোন কারণ নেই।

আপন তেজ সমাহারো আপই। 

তীনো লোক হাঁক তে কাঁপই।। ২৩।।

হনুমানজির ক্ষমতা এত অপরিসীম যার কারণে  স্বর্গ, মর্ত্য ,পাতাল তার বশ্যতা  স্বীকার করেন।

ভূত পিশাচ নিকট নহি আবই।

 মহাবীর জব নাম সুনাবই।।২৪।।

হনুমানজীর নাম জপ করলে দৈত্য, দানব পিশাচ কেউ কাছে আসতে পারবে না।

নাসই রোগ হরই সব পীরা

জপত নিরন্তর হনুমদত বীরা।।২৫।।

ধন্বন্তরী দ্বারা আশীর্বাদ প্রাপ্ত হনুমানজির নাম জপ করলে সমস্ত রোগ পীড়া দূর হয়ে যাবে।

সংকট তে হনুমান ছড়াবৈ।

 মন ক্রম বচন ধ্যান জো লাবৈ।।২৬।।

জীবনে যতই বাধাবিপত্তি আসুক হনুমানজি সব বাধা-বিপত্তি থেকে রক্ষা করবে।

সব পর রাম তপস্বী রাজা

তিন কে কাজ সকল তুম সাজা ।।২৭।।

ভগবান রাম একজন তপস্বী রাজা সুতরাং তিনি নিজেই ভগবান রামের সমস্ত কাজ করে দিতে উদ্যোগী।

ঔর মনোরম জো কই লাবৈ।

সেই অমিত জীবন ফল পাবৈ।।২৮।।

একজন ভক্ত যা চান হনুমানজি তাকে অনেক বেশি দিয়ে থাকেন, কারণ তিনি কখনোই চান না ভক্তরা ভগবান রামকে কোনভাবে বিরক্ত করুক।

চারো যুগ পরতাপ তুমহারা।

হৈ পরসিদ্ধ জগত উজিয়ারা ।।২৯।।

চার যুগেই ভক্তরা হনুমানজির জয়গান করবে। (চার যুগ অর্থাৎ সত্য ,ত্রেতা ,দ্বাপর, কলি)।

সাধুসন্ত কে তুম বারে।

অসুর নিকন্দন রাম দুলারে।।৩০।।

হনুমানজি হলেন সাধু-শান্তদের রক্ষাকর্তা। সেই জন্য তিনি ভগবান রামের প্রিয় পাত্র।

অষ্ট সিদ্ধি নৌ নিধি কে দাতা।

অস বর দান জনকী মাতা।।৩১।।

অশোক বাটিকায় সীতা মাতার সঙ্গে দেখা হলে সীতা-মাতা তাকে অষ্টসিদ্ধি ও নবনিধি দিয়ে আশীর্বাদ করেন। (অষ্টসিদ্ধি  -হনুমান জির রূপ পরিবর্তনের সক্ষমতা ,যেমন বিশালাকায় হওয়া ,ছোট হওয়া, হালকা হওয়া । নবনিধি — সোনার পদ্ম, সোনার কচ্ছপ।)

রাম রসায়ন তুমহারে প্যাসা।

সদা রহো রঘুপতি কে দাসা।।৩২।।

ভগবান রামের নাম হনুমানজির কাছে অমৃতের সমান। তাই তিনি আজীবন রামচন্দ্রের দাস হয়ে থাকতে চান।

তুমহারে ভজন রাম কো পাবৈ।

জনম জনম কে দুখ বিসরাবৈ।।৩৩।।

যে ভক্ত রামচন্দ্রের নাম জপ করবে হনুমানজি তাকে রামচন্দ্রের সঙ্গে মেলাবে এবং জন্ম-মৃত্যু শৃংখল থেকে মুক্ত করবে।

অন্তকাল রঘুবরপুর জাই।

জহা জন্ম হরিভক্ত কহাই।।৩৪।।

হনুমানজি অন্তর থেকে এত পরিষ্কার যার কারণে সকল ভক্তগণ রামচন্দ্রের নাম স্মরণে রাখবেন।

ঔর দেবতা চিত্ত না ধরই।

হনুমত সেই সর্ব সুখ করই।। ৩৫।।

তুলসীদাস জীবনে অন্য কোন দেবতার আশীর্বাদ চান না। তিনি কেবলমাত্র হনুমানজির আশীর্বাদই চান।

সংকট কাটঐ মিটই সব পীরা।

জো সুমিরই হনুমত বলবিরা।।৩৬।।

যে ব্যক্তি হনুমানকে স্মরণে রাখবে তার বাধা-বিপত্তি সব দূর হয়ে যাবে।

জই জই জই হনুমান গোঁসাই।

কৃপা করহু গুরু দেব কী নাই।।৩৭।।

হনুমানজি কৃপা করে  ভগবান রামের সহিত আমাদের মেলান।

জো শতবার পাঠ কর কোই।

ছুটহি বন্দি মহাসুখ হোই।।৩৮।।

 

হনুমান চালিশা পাঠের নিয়মঃ 

 

যে ব্যক্তি নিয়মিত হনুমান চালিশা পাঠ করবে, সেই ব্যক্তি জীবন মৃত্যুর বন্ধন থেকে মুক্তি পাবে।

জোয়হ পরই হনুমান চালিশা।

হোয় সিদ্ধ সাখী গৌরিসা।।৩৯।

যে ব্যক্তি হনুমান চালিশা পড়বে তার আত্মার শুদ্ধিকরণ হবে।

তুলসী দাস সদা হরি চেরা।

কীজই নাথ হৃদয় মহ ডেরা।।৪০।।

তুলসীদাস কামনা করেছেন রামচন্দ্র ,লক্ষ্মণ, সীতামাতা ও হনুমানজি সদা সর্বদা যেন তাঁর হৃদয়ে বিরাজ করে।

পবন তনয় সংকট হরণ,

 মঙ্গল মূরতীরূপ

রাম লক্ষণ সীতা সহিত,

 হৃদয় বসহু সুর ভূপ।।

পবন পুত্র হনুমান সমস্ত বাধা-বিপত্তি দূর কর।

যে তোমায় স্মরণ করবে তার জীবনে সব সময় ভালো কিছু হবে। রাম লক্ষণ সীতা আমার হৃদয়ে এসে বসবাস কর।

হনুমান চালিশা

Leave a Comment